বিল্ডিং বানানোর আগে যা কিছু জানা প্রয়োজন: অভিজ্ঞতা থেকে লেখা

বিল্ডিং তোলার আগে:

মাটি পরীক্ষা:

: কী বলেন! মাটি আবার পরীক্ষা করতে হয় নাকি, আর করেই বা কিভাবে?

: ফুট দশেক নিচের মাটি তুলে লবন ছিটিয়ে চেটে টেস্ট করবেন।

যেখানে ভবন বানাবেন সেই যায়গার অতীতটা একটু জেনে নিন। ছোট বেলা থেকে দেখে আসছেন শুকনো ঠনঠনে যায়গা। কিন্তু দেখা গেল আপনার দাদার বাবা সেখানে বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। সেই মাছ খেয়ে দাদা পরিপুষ্ট হলেন, আর আপনার নাতি নাতনি একই যায়গায় বানানো বিল্ডিঙে বসে মাছ খাওয়ার সময় কিছু একটা ঘটে গেলে তার দায় আপনার দাদা নেবেন না নিশ্চই, আপনাকেই নিতে হবে। এমনিতে দুই বা একতলার জন্য সমস্যা না, কিন্তু তার বেশি হলে মাটি পরীক্ষা করিয়ে নিতেই হবে।

কিছু টাকা খরচ হবে বটে তবে অপচয় হিসেবে দেখা যাবে না। আমিও করতে চাই নি, কিন্তু এক অভিজ্ঞ বড় ভাই বললেন দেহের রক্ত পরীক্ষার মতই গুরুত্বপূর্ণ মাটি পরীক্ষা করা। কারণ তার উপরই বিল্ডিংটা দাড়িয়ে থাকবে, কতদিন দাড়িয়ে থাকবে সেটা জানা দরকার। আর মাটি ভাল না হলে ডিপ ফাউন্ডেশন করতে হবে।
সয়েল টেস্টের রিপোর্ট ছাড়া ইঞ্জিনিয়ার নকশায় সাক্ষর করবেন না।

: ইঞ্জিনিয়ার! 😮 ! ইঞ্জিনিয়ার লাগে নাকি, কন্ট্রাক্টররা কী কম জানে। কাজ করতে করতে তারা ইঞ্জিনিয়ারদের চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ।
: কন্ট্রাক্টররা অনেক জানে। এতোই জানে তারা প্রশ্ন পত্রের সবগুলো অংক এক (a+b)2  সূত্র দিয়ে করে ফেলবে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে ইঞ্জিনিয়াররা যে সূত্র বাতিল করে দেয় কন্ট্রাক্টররা তা বুক দিয়ে আগলে রাখে। আপনার মাটি যেমনই হোক, বিল্ডিঙের সাইজ যেমন হোক, ডিজাইন যেমনই হোক, একভাবে বানিয়ে দেবে। বলবে রড বেশি দিয়েছি তো। রড বেশি দিয়েছেন, বিল্ডিং দারুন শক্তিশালী হয়েছে! সবসময় রড বেশি দিলে কিন্তু কাজ হয় না। রডগুলো সিস্টেমেটিক দিতে হবে।

কন্ট্রাকটরদের প্রথম সূত্র হল ‘আমরা সব যায়গায় এই ভাবে করি’ ‘আশেপাশে সবাইতো এইভাবে দিচ্ছে’। আর সবশেষে রয়েছে পিথাগোরাসের অব্যর্থ সূত্র- “আল্লাহ ভরসা”। আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন না যে চেষ্টা করে না। আপনার কাজটা ঠিক মত করে তারপর বলুন আল্লাহ ভরসা। এই ভরসার উপর আপনাকে নির্ভর করতেই হবে পৃথিবীর শক্তিশালীতম বিল্ডিং বানালেও।

বিল্ডং বানানোর ক্ষেত্রে আগাগোড়া যে সূত্রটা মেনে চলবেন তা হল খাতিরের লোক দিয়ে কোনো কাজ নয় আর কোনো ভিআইপিকে নিয়োগ দেবেন না। পেশাদার লোকের কাছে যাবেন, কাট কাট কথা হবে, উপযুক্ত মূল্য দেবেন, কাজ বুঝে নেবেন। খাতিরের লোক আপনার কাজ মধুসূদনের মহাকাব্য রচনার মত দরদ আর শিল্পের ছোয়ায় করে দেবে, আপনি নাকে তেল দিয়ে ঘুরবেন সে আশার গুড়ে বালি নয় একেবারে আলকতারা। খাতিরের লোকের দৌড় যদি খাল পর্যন্ত তবে তাকে নিয়ে নদীতে নামতে পারবেন না।

আর যদি ভিআইপি হয় তবে তাকে কাজে আনার জন্য তার সেক্রেটারিকে ফোন দিয়ে কাজের এপয়েনমেন্ট নিতে হবে।

ইঞ্জিনিয়ার, কন্ট্রাক্টর, প্লাম্বার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, কাঠ মিস্ত্রি সবার বেলায় এই কথা। বিল্ডিং বানানো হলে সব খাতিরের লোককে দাওয়াত করে হেভি করে আপ্যায়ন করবেন, কিন্তু কাজ করাবেন উপযুক্ত লোক দিয়ে।

আগে নিজে সিদ্ধান্ত নিন কেমন বিল্ডিং বানাবেন। চিন্তা ভাবনা শুরু করবেন অন্তত ৬ মাস আগে। বাড়ীর সবার পরামর্শ নিন, মন দিয়ে শুনুন সবার মত, দুই একটা ভাল লাগলে গ্রহণ করুন। আর সবাইকে খুশি করতে যাবেন না, তাহলে পরে নিজে খুশি হতে পারবেন না। আর নকশা করার আগে সিদ্ধান্ত পাঁকা করলে সুবিধা। পরে ডিজাইনে পরিবর্তনের দরকার হলে অনেক কিছুই ভজঘট হয়ে যায়।

আমাদের দেশে নভেম্বর-ডিসেম্বর কাজ শুরু করার সেরা সময়, সেই হিসেবে জুনেই প্রক্রিয়া শুরু করে দিন।

ইঞ্জিনিয়ার কিভাবে বাছাই করবেন?

দু/তিনটা প্রতিষ্ঠিত আর্কিটেকচারাল ফার্মে যান। আপনার চাহিদা খুলে বলুন, মূল্য জেনে নিন। এর পর যে প্রতিষ্ঠান ভাল লাগবে তাদের কাজ দিন। কাজ করার জন্য সময় দিন। সমস্ত নকশা হাতে পাওয়ার পর কাজ শুরু করুন। নকশা পাবার পর অন্তত এক সপ্তাহ গবেষণা করুন, সব আপনার চাহিদামত হচ্ছে কিনা, কোনো অসঙ্গতি আছে কিনা। আর বলে দেবেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও আর্কিটেক্ট একসাথে বসে সব খুটিনাটি বিষয় সমাধান করে আপনাকে যেন নকশা দেয়। আর্কিটেক্ট দেখে শুধু ডিজাইনের সৌন্দর্য আর ব্যবহারিক দিক, আর স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার দেখে স্ট্রেংথ। দুইজনের মধ্যে একটা দ্বৈরথ আছে। দেখা গেল আর্কিটেক্ট একটা সরল দেয়াল দিয়েছে, ইঞ্জিনিয়ার সেখান দিয়ে একটা কলাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট ছোট এরিয়ার ডিজাইন আলাদা আলাদা করতে হতে পারে। তখন যেন এক এরিয়ার সাথে আরেক এরিয়ার ডিজাইন কনফ্লিক্ট না করে।

এলাকার সবচে’ সেরা কন্ট্রাক্টরকে বাদ দিন। তার হাতে অনেক কাজ, আপনার বিল্ডিং সে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে করতে পারবে না। আপনার মুখে বলে দেয়া অনেক কথাই সে ভুলে যাবে। আপনার দরকারের সময় হয়তো তাকে পাবেন না।

এমন কাউকে নিন যে শিক্ষিত, ইঞ্জিনিয়ারিং টার্মগুলো বুঝে, কিন্তু এখনো ভিআইপি হয়ে উঠে নি, হাতে বেশি কাজ নেই এবং আগে কয়েকটা করেছে। সে আপনার কাজটাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে নেবে। আপনার বিল্ডিংটাকে তার একটা মাইলফলক হিসেবে দেখবে। সময় থাকলে তার বানানো বিল্ডিংগুলো ঘুরে দেখতে পারেন।

সবসময় কাগজ-কলম নিয়ে ঘুরবেন। সব পক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো লিখে দেবেন, মুখের কথা তারা যত্নের সাথে ভুলে যান।

[আপডেট হতে থাকবে]

Leave a reply