কৃষ্ণমার্জারবধ কাব্য!

 

Black Cat

 

একখানি কৃষ্ণমার্জারকে লইয়া যাহা কিছু হট্টগোল বিগত কিয়ৎদিন যাবৎ মিডিয়াস্ফিয়ারে হইতেছে, তদ্দৃষ্টে মার্জারকুল যৎপরোনাস্তি শ্লাঘা বোধ করিবেক- ইহা নিশ্চয় করিয়া কওয়া যায়। এক্ষণ আন্তর্জাল কেবলি মার্জারচিত্রে সয়লাপ্। কিন্তুক কী ঘটিয়াছে আসলে? হঠাৎ করিয়া জাহেল মিডিয়া ‘বিলাই’ লইয়া পড়িল কোন দুঃখে? সিরিয়া ফর্দাফাই হইতেছে, মায়ইন্দোনেশিয়া ভারত মহাসাগর কম্পিত হইলো, বার্সেলোনা রিয়ালের স্কন্ধোপরি তপ্তশ্বাস ফেলিতেছে, শাহরুখ খানকে ন্যুইয়র্কে নাকাল করা হইতেছে- মানবকুলের তাবড় তাবড় খবর হেলায় ফেলিয়া হতচ্ছাড়া মিডিয়া বিলাই লইয়া কুঁদিতেছে- ভাবিলেই হৃদকম্প উপস্থিত হয়। পক্ষীকুল, মক্ষিকাকুল, পুষ্পরাজি, অকালবরিষণ ইত্যাকার অ্যাপিলসমৃদ্ধ বিষয়াদিকে ইগনোর করিয়া মর্কট-মার্জার নিয়া পড়িলে সঙ্গত কারনেই ভ্রম হয় তবে কি মিডিয়াকে ‘চৈতা পাগলে’ পাইয়াছে? নাকি সত্যি সত্যিই চৈত্রসংক্রান্তির প্রাক্কালে সুরঞ্জিতবাবুর শিরে সংক্রান্তি উপস্থিত? অবোধ মিডিয়া বাবুমশায়কে এমনকি ঝাড়িয়া কাশিতেও দিতেছেনা। যেইখানে স্বয়ং বাবুমশায় কহিতেছেন, নিজস্ব সম্পদ লইয়া যদেচ্ছাগমন সকল বঙ্গনাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার; সেইখানে মিডিয়া সম্পদঅলার কুষ্ঠি-ঠিকুজি লইয়া বেয়াড়া ‘কুর্চেন’ তুলিতেছে। নিশুতিকালেই কেন এই সম্পদের বস্তা স্থানান্তরের তাড়না উপস্থিত হইবে; তাহাও আবার রেলওয়ের জনৈক চোট্টা সমভিব্যাহারে- ইহাও কেহ কেহ কহিতেছেন। সম্পদ স্থানান্তরের অভিমুখ কেন জিগাতলা তথা বাবুমশায়ের বাটীমুখী- ইহাও কোনো কোনো দূর্মুখ ব্যক্ত করিতেছেন। হা হতোস্মি! তাবৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সদা-উচ্চকণ্ঠ, ন্যাপের ডিঙা হইতে আওয়ামি লীগের নৌকায় পাড়ি জমানো সাত সাতবারের ঝানু পার্লামেন্টারিয়ানের উক্তিতে তিলার্ধ সংশয় করিবে- এহেন সাংঘাতিক সাংবাদিকও তবে ভূ-ভারতে আছে! বানরে সঙ্গীত গায়; শিলা জলে ভাসি যায়/ দেখিলেও না হয় প্রত্যয়।

বাবুমশায়ের সহকারী একান্ত সচিব শ্রীমান ওমর ফারুক ২০০২ হইতে অদ্যাবধি তাহার সেবা এস্তেমাল করিয়া যাইতেছিলেন। করিবেন না-ই বা কেন? এই পদখানির মাহাত্ম্যই সেইটে। মন্ত্রীবর্গ তাঁহাদের নিজস্ব ‘দিলকি আরমাঁ’ অনুযায়ী এপিএস নিযুক্ত করিবেন- এইটেই বিধি। তো সেই বিধানানুযায়ী নিযুক্তিপ্রাপ্ত  ফারুক সায়েব প্রকারান্তরে বাবুমশায়ের একরকম হস্ত, পদ, জবান ও কর্ণেন্দ্রিয় হইবেন- বলাই বাহুল্য। তাই আমাদিগের কিছুমাত্র বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটে না যখন বাবুমশায় বলিষ্ঠকণ্ঠে ঘোষণা করেন যে পরবর্তী দিবসেও ফারুক সায়েব অবিশ্যিই তদীয় দায়িত্ব পালন করিবেন- তাহাকে বরখাস্ত করিয়া প্রকারান্তরে নিজকে কানা-নুলা করিবার তিলমাত্র অভিলাষ তাঁহার নাই। ব্রাভো! বাঘের বাচ্চা! নিজস্ব চাকর-বাকরদিগের প্রতি গৃহস্থের ঈদৃশ করুণাবারিবর্ষণ ইদানিংকালে দুর্লভ। মাগার অধমের ক্ষুদ্রমস্তিষ্ক কিঞ্চিৎ আউলাইয়া গেলো যখন দেখিলাম সেইদিন অপরাহ্ণেই গৃহস্থ ক্রীতদাসের প্রতি বিমুখ হইয়া পিঠটান দিলেন! তিনি ঘোষণা করিলেন- পাপিষ্ঠ ফারুককে ত্রিসীমানায় না ঘেঁষিতে ‘কড়া’ নির্দেশ প্রদান করা হইয়াছে। এমনকি তিনি ইহা পর্যন্ত কহিলেন, পারিলে চোট্টা মৃধামশায়কেও তিনি একহাত দেখিয়া লইতেন, কিন্তুক তাঁহার ততদূর ক্ষমতা নাই। একেবারে যাহাকে বলে “মারিয়া করিবো খুন!” ফারুক সায়েব্ গুরুর বাণীমোতাবেক পলাইয়াছেন সেইটে স্পষ্টতঃই প্রতিভাত; কিন্তুক মৃধাবাবু কাহার আদেশে পক্ষকালের ছুটি লইয়া আত্মগোপনে যাইলেন- যাইবার পূর্ব্বে প্রকাশ করিয়া গেলেন না।

ঘটনা ঘটিবার পর দুই দুইখানি সংবাদ-সম্মেলনেও দাদাবাবু ষট্-যন্ত্রের কথা কিছুমাত্র আভাস দেন নাই। তিনি বরঞ্চ বিরক্তস্বরে বিজিবি’র এখতিয়ার লইয়া কথা তুলিয়াছিলেন। বিজিবি যে কাহাকেও গেরেপ্তার করিতে পারে না, তাহাদের কার্য যে কেবল সীমান্তরক্ষার্থে ওপারের দাদাদের খর্গাঘাতে শহীদ হওয়া- আইনের এই গূঢ়তত্ত্ব তাহারই জবান হইতে মূর্খ বাঙাল জানিতে পারিলো। ম্যাঙ্গোপাবলিক আরো জানিয়া সোয়াস্তি পাইলো যে, টাকার বস্তা যদিবা তদন্তে ফারুক সায়েবের স্বীকৃত উপার্জনের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়, তাহার দেখভাল করিবার এখতিয়ার এনবিআর-এর। গরজ বোধ করিলে এনবিআর তাহা লইয়া ধান্দা-ফিকির করিবে। পুলিশ-টুলিশের কোনো ‘বেইল’ এইখানে নাই। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা তো রীতিমতোন বেআইনী। বাস্তবিক, ইহার ন্যায় আইনপটু একজন প্রতিভাকে বাঙালরাজ্যের আইনমন্ত্রী না করিয়া নিছক ঝমাঝমমন্ত্রী করিয়া কেন রাখা হইয়াছে- ভাবিলে লাজে মস্তক আপনাআপনি হেঁট হইয়া আসে। আপনার মঙ্গল বাঙালের জাত কোনোদিনই কি মালুম করিবেনা? নীরদ সি চৌধুরির ‘আত্মঘাতী বাঙ্গালী’ কি আর এমনি এমনিই রচিত হইয়াছে!

ইহারই মধ্যিখানে ডিগবাজিপটু আরেক আইনের ব্যাপারি আসিয়া সুরঞ্জিতবাবুকে রীতিমতোন ‘বন্ধু’ সম্বোধন করিয়া বিচারবিভাগীয় তদন্তের আর্জি জানাইয়াছেন। দুই বন্ধুর মধ্যে কাহার মাসআলায় উজবুক জনগণ আস্থাজ্ঞাপন করিবে? মওদুদীয় (সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী নন কিন্তু) তত্ত্ব কি তবে মিছা? ব্রহ্মা জানেন! আমি যেইটে জানি সেইটে হচ্ছে- মওদুদ আহমদ সাহেবের মিত্রদিগের তিনি ভিন্ন অপরাপর কোনো শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না। চৌর্যবৃত্তিতে বমাল ধৃত হইয়া বাবুমশায় ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটির’ একখানি বন্ধু অন্তত শেষকালে কুড়াইয়া পাইয়াছেন।

সুরঞ্জিতবাবু আরেকখানি গুগলি ছাড়িয়াছেন এই বলিয়া যে ফারুকের সহিত তাহার তৎক্ষনাৎ কোনো বাক্যালাপ হয় নাই, কথা হইয়াছে ‘পরদিন’। তিনি যথার্থই কহিয়াছেন। রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময়কার ঘটনা যদি তিনি মাত্র অর্ধঘন্টা পরেও জানিয়া থাকেন তবে তাহা ‘পরদিন’ তো বটেই! কিন্তুক দাদা ফাঁসিয়া গিয়াছেন এটিএন-এর টেলিরেকর্ডে। উক্ত টেলিকথোপকথনে আমরা দেখিতে পাই ঘটনার পরপরই এপিএস ফারুক সাংবাদিককে জানাইতেছেন যে তাহার ‘গুরু’ আগামী প্রত্যূষেই এতদ্বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়া সকল খোলাশা করিবেন। ইত্যবসরে গুরুর সহিত বাক্যবিনিময় না হইলে ফারুক সায়েব্ সাংবাদিককে ইহা কীরূপে জানাইতে পারিলেন? ভবিষ্যত গণিয়া দেখিয়া? সেলুকাসের কথা ইয়াদ পড়িয়া যায়।

এই ডামাডোলের মাঝে শকটচালক আজিম মিঞাকে কেহই সন্ধান করিতেছেন না। বিজিবি কাহার আজ্ঞানুসারে তাহাদের সীমানায় ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদিগকে’ নিয়মানুযায়ী আইনরক্ষাকারী বাহিনীর হস্তে অর্পণ না করিয়া মুক্তকচ্ছ করিয়া দিল, কাহা অভিপ্রায়ানুসারে বেচারা ‘ডেরাইবার্’কে কেবল আটক করিয়া রাখা হইলো, অর্থ এবং বাহন আলামত হিসাবে জব্দ করা হইলো না কাহার অঙ্গুলিহেলনে- অত্যাশ্চর্য কোনো কারণে ইহা কেহ জানিবার আগ্রহ বোধ করিতেছেন না। সকল রথী-মহারথীগণ বিবিধ টিভি চ্যানেলের বিবিধতর টক-শোগুলাতে গলদঘর্ম হইতেছেন কেবল একটি বিষয় লইয়া- কালো বিড়ালের ইস্তফা দেওন কী কী কারণে উচিৎ হইবে এবং কেহ কেহ সাফাই গাহিতেছেন যে, বিড়ালখানি আদতে ততোখানি কৃষ্ণবর্ণ নহে যতখানি মসিলেপন করিয়া দেখানো হইতেছে।

এই বিশেষ ঘটনাটিতে কন্সপিরেসী থিওরীতে আমার ঠিক প্রতীতি হয় না, সদাপ্রগলভ্ সুরঞ্জিতবাবুর কথাতে স্বভাবসুলভ সেই বক্রতা কিম্বা শ্লেষের ঘাটতি এবং সাংবাদিকদিগকে অশিষ্ট উপায়ে তিরস্কারকরণ ইঙ্গিত দেয় যে ডালের মধ্যিখানে ‘কালা’ কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকিলেও থাকিতে পারে। দুই দূর্জন উবাচের মুখ বন্ধ করিবার নিমিত্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুইজনকে মন্ত্রী বানাইয়াছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানিয়া পুলকিত হইবেন হয়তো ইহাদের মধ্যিখানে অন্তত একজনের জবান প্রকৃতার্থেই বন্ধ করা গিয়াছে। সংবাদ-সম্মেলনে বাবুমশায়কে কথা হাতড়াইতে দেখিয়া ইহাই ভাবিলাম। আফসুসের সহিত আরেকখানি কথাও চিত্তে উদিত হইলো; মোনাজাতউদ্দিনের মতোন শিকড়সন্ধিৎসু সাংবাদিক আজিকার যুগে আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না; মর্ত্যলোক সুরলোক ঢুঁড়িয়া ফেলিলেও না- বাঙাল country তো ছার!

Published by মামুন আব্দুল্লাহ্

নিজেকে লইয়া বাগাড়ম্বর করিয়া কহিবার মতোন কিছুমাত্র নাহি; তথাপি বঙ্গীয় বর্ণে আত্মরঞ্জন করিবার একখানি স্থান অদৃষ্টক্রমে জুটিয়া গেলোই যেহেতু- ইহার এস্তেমালকরণ বিধেয় বোধ করি। অধমের সাকিন দোহার, চাকুরিঘটিত কার্য্যোপলক্ষ্যে বাটীতে অবস্থানকরণ প্রায়শঃই দুরূহ- কাজে কাজেই প্রকৃতার্থে 'দোহারী' নহি। নিরীহ বাচ্চা-কাচ্চাদিগের উপর মানসিক উৎপীড়ন চালানো দিলপসন্দ বিধায় ইহাকেই সাংবাৎসরিক বৃত্তি হিসাবে গ্রহণ করিয়াছি। জবান এবং হস্ত চালানোর মধ্যিখানে কিয়ৎকাল বিরতি পাইলে উদরান্ন সংস্থানের নিমিত্তে নানাবিধ তুকতাক বুজরুকিও করিয়া থাকি। বর্ষপঞ্জি যদি বিশ্বাস করি- আমি বয়সকে পাইয়াছি (প্রাপ্তবয়স্ক); ভাবীকালে মননকে পাইব; এরাদা রাখি...

Join the Conversation

3 Comments

  1. একবার এডিট করিতে গিয়া সাফল্যের সহিত লেজেগোবরে করিয়া ফেলিলাম বোধ হয়। পুনর্বার এডিট প্যানেলে ঢুকিতে সাহস হয় না। যেইভাবে আছে, থাকুক।

    যেই দেশে যেই বাক্যে কহে নরগণ
    সেই বাক্যে বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন…
    😉

Leave a comment